Ticker

8/recent/ticker-posts

শিং মাছ চাষ পদ্ধতি

এক সময় আমাদের খাল-বিল-হাওর-বাঁওড়েপ্রচুর শিং মাছ পাওয়া যেত। বিভিন্ন কারণেপ্রাকৃতিক এই সব অভয়াশ্রম নষ্ট ও সংকুচিত হয়েযাওয়ার ফলে এখন আর শিং মাছ তেমন একটাপাওয়া যায় না। সে সব দিনে শিং মাছ পুকুরে চাষহত না। যে কারণে বছর কয়েক আগে শিং মাছপ্রায় বিলুপ্তির পথে চলে গিয়েছিল। আশার কথাহল এই যে, আমাদের দেশের মৎস্য খামারিরাকৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন করেশিং মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতেপেরেছে। সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়েএসেছে মৎস্য বিভাগ ।


পুকুর নির্বাচন:
শিং মাছ চাষের জন্য পুকুর নির্বাচনের সময়কয়েকটা দিক লক্ষ্য রাখতে হবে-
১.  পুকুর অবশ্যই বন্যামুক্ত হতে হবে।
২. পুকুরের পাড় মজবুত হতে হবে। কোন প্রকারছিদ্র থাকলে সমস্ত- শিং মাছ চলে যাবে।
৩. বর্ষাকালে বৃষ্টির সময় পানির উচ্চতা ৪ ফুটেরবেশি হবে না এই জাতীয় পুকুর নির্বাচন করতেহবে।
৪. চাষের অভিজ্ঞতা আছে এমন চাষিদের থেকেজানা গেছে যে, শিং মাছের পুকুর আয়তাকারহলে ভাল ফল পাওয়া যায়। বর্গাকার একটিপুকুরের চেয়ে আয়তাকার পুকুরে একই হারেখাদ্য ও ব্যবস্থাপনায় কমপক্ষে ১০ ভাগ বেশিউৎপাদন হয়।
৫. পুকুরের আয়তন ৪০/৫০ শতাংশের মধ্যে হলেভালো হয় এবং পুকুরের তলদেশ এক প্রান্ত- অন্যপ্রান্তের চেয়ে ১ ফুট ঢালু রাখতে হবে যাতে মাছধরার সুবিধাসহ পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখাযায়।

পুকুর প্রস্তুত:
নতুন ও পুরাতন উভয় ধরনের পুকুরে শিং মাছচাষ করা যায়। তবে নতুন পুকুরের চেয়ে পুরাতনপুকুরে শিং মাছ চাষ ভাল হয়। নতুন পুকুরে শিংমাছ চাষ করলে পুকুর ভালভাবে চাষ দিয়ে প্রতিশতাংশে কমপক্ষে ২০ কেজি গোবর ও ভালভাবেমই দিয়ে তারপর চুন দিতে হবে। তাতে মাটিরউর্বরতা বাড়বে। শিং মাছের পুকুর উর্বর নাথাকলে অনেক সময় শিং মাছ মজুতের পরপোনা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়।পুরাতন পুকুরে শিংমাছ চাষের জন্য প্রথমেই সেচ দিয়ে শুকিয়েফেলতে হবে। পুকুরের তলায় বেশি কাদা থাকলেউপরের স্তরের কিছু কাদা উঠিয়ে ফেলতে হবে।এরপর চুন দিতে হবে শতাংশ প্রতি ১ কেজি।তারপর পুকুরের চারদিকে জাল দিয়ে ভালভাবেঘের দিতে হবে। এতে কোন সাপ বা ব্যাঙ পুকুরেঢুকতে পারবে না। ব্যাঙ বেশি ক্ষতিকর না হলেওসাপ শিং মাছের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শিংপোনার চলার ধীর গতির কারণে সাপ অনেকপোনা খেয়ে ফেলতে পারে। চারপাশে জালদেয়ার পর পুকুরে শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে ২ থেকে ৩ফুট পরিষ্কার পানি দিতে হবে। পানি দেয়ার ২/৩দিনের মধ্যে পোনা ছাড়তে হবে। পোনা ছাড়ারপর এক ইঞ্চি ফাঁসের একটি জাল পেতে রাখতেহবে তাতে পুকুরের ভেতর কোন সাপ থাকলে ওইজালে আটকা পড়বে।

পোনা মজুদ:
পুকুর প্রস্তুতের পর গুণগতমানের পোনাউৎপাদনকারী হ্যাচারি থেকে প্রায় ২ ইঞ্চিসাইজের পোনা মজুদ করতে হবে। আজকালপোনা উৎপাদন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ারকারণে অনেক হ্যাচারিই শিং মাছের পোনাউৎপাদন করে। কিন্তু পোনাকে কীভাবে মজুদকরলে পোনার মৃত্যহার কম হবে বা আনুসাঙ্গিকব্যবস্থাপনা কি হবে তা অধিকাংশ হ্যাচারিই নাজানার কারণে শিং মাছের পোনা মজুদের পরব্যাপকহারে মড়ক দেখা দেয়। প্রথমে যা করতেহবে তা হল, হ্যাচারিতে পোনা তোলার পরকন্ডিশন করে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসলদিয়ে তারপর পোনা ডেলিভারি দিতে হবে। পোনাপরিবহনের পর এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসলদিয়ে পুকুরে ছাড়তে হবে। আর তা না হলে পুকুরেছাড়ার পর পোনা ক্ষতরোগে আক্রান্ত- হতেপারে। পুকুরে পোনা ছাড়ার ২/৩ দিন পর আবারএকই জাতীয় ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।এতে শিং মাছের পোনা মজুদের পর আর কোনরোগবালাই আসবে না।

মজুদ ঘনত্ব :
শিং মাছ এককভাবে বা মিশ্রভাবে চাষ করা যায়।
মিশ্রভাবে চাষ – কার্প জাতীয় মাছের সাথে প্রতিশতাংশে ৩০টি পর্যন্ত- আঙ্গুল সাইজের শিংমাছের পোনা ছাড়তে হবে। পোনা মজুদের সময়পোনাকে এন্টিফাঙ্গাস মেডিসিনে গোসল দিয়েতারপর পুকুরে ছাড়তে হবে। কার্প জাতীয় মাছছাড়া তেলাপিয়া এবং পাঙ্গাসের সাথেও শিংমাছের মিশ্রচাষ করা যায়। সে ক্ষেত্রে প্রতিশতাংশে ৫০টি পর্যন্ত- শিং মাছের পোনামিশ্রভাবে ছাড়া যায়।কার্প জাতীয়, তেলাপিয়া বাপাঙ্গাসের সাথে শিং মাছ চাষ করলে বাড়তিখাবারের প্রয়োজন হয় না। পুকুরের তলায়উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়েই এরা বড় হয়ে থাকে।উপরোন্ত- এই জাতীয় মাছের পুকুরে শিং মাছমিশ্রভাবে চাষ করলে পুকুরে অ্যামোনিয়াসহঅন্যান্য গ্যাসের কম হয়।
একক চাষে শিং মাছ চাষ – প্রতি শতাংশে ৫০০থেকে ১০০০ টি পর্যন্ত ছাড়া যায়। এবং এটা বেশীলাভজনক ।

খাবার প্রয়োগ পদ্ধতি :
পুকুরে শিং মাছের পোনা মজুদের পর প্রথম ১০দিন দৈনিক মাছের ওজনের ২০% খাবার প্রয়োগকরতে হয়। ছোট থাকা শিং মাছ সাধারণতরাতের বেলায় খেতে পছন্দ করে; তাই ২০%খাবারকে দু’বেলায় সমান ভাগ করে সন্ধ্যার পরঅর্থাৎ ভোরের দিকে একটু অন্ধকার থাকতেপুকুরে প্রয়োগ করতে হয়। মাছ মজুদের ১১ তমদিন থেকে ২০ দিন ১৫% হারে এবং এর পরের১০ দিন মাছের ওজনের ১০% হারে পুকুরেখাবার প্রয়োগ করতে হয় একই নিয়মে। এভাবেএক মাস খাবার প্রয়োগের পর ৫% হারে পুকুরেখাবার দিতে হবে। শিং মাছ ছোট থাকা অবস্থায়রাতে খাবার খেলেও ৩ ইঞ্চির মত সাইজ হওয়ারসাথে সাথে দিনের বেলাতে খাবার দিতে হবে।সন্ধ্যার পর যে খাবার দেয়া হত সেটি সন্ধ্যারএকটু আগে এগিয়ে এনে আস্তে আস্তে বিকেলেদিতে হবে। অন্যদিকে ভোর বেলার খাবারওএমনি করে সকাল ৯/১০ টার দিকে পিছিয়েনিতে হবে। শিং মাছের ওজন ১৫ গ্রাম হলে ৩%এর অধিক খাবার দেয়া মোটেই ঠিক নয় এবংবিক্রির আগ পর্যন্ত এই নিয়মই বজায় রাখতেহবে।

সতর্কতা:
পুকুরে বেশি পরিমাণ খাবার দিলে পানি নষ্ট হয়েযেতে পারে যা শিং মাছ চাষের একটি বড়অন্তরায়। শীতকালে শিং মাছ

চাষের জন্য করণীয়:
শীতকালে শিং মাছের রোগবালাই থেকে রক্ষারজন্য প্রতি ১৫ দিন অন্তর অন্তর পুকুরের পানিপরিবর্তন করতে হয়। সাথে প্রতি মাসে একবারএন্টিফাঙ্গাস মেডিসিন দেয়া দরকার। পানিরউচ্চতা ২ ফুটে রাখা বাঞ্চনীয়। গ্যাস দূর করতেকোন অবস্থাতেই শিং মাছের পুকুরে হররা টানাযাবে না। এতে শিং মাছ খাবার ছেড়ে দিয়ে আরোবেশি গ্যাসের সৃষ্টি করবে। নিচের অ্যামোনিয়াগ্যাস দূর করতে গ্যাসোনেক্স ব্যবহার করা যেতেপারে।

শিং মাছ আহরণ পদ্ধতি:
অন্যান্য মাছ জাল টেনে ধরা গেলেও শিং মাছজাল টেনে ধরা যায় না। শিং মাছ ধরতে হলে শেষরাতের দিকে পুকুর সেচ দিয়ে শুকিয়ে ফেলতেহবে। শিং মাছ ধরার উত্তম সময় হল ভোর বেলাথেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত। রোদের সময় মাছধরলে মাছ মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। মাছধরার পর মাছ থেকে গেলে শ্যালো দিয়েকমপক্ষে ২ ফুট ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পুকুর ভরেরাখতে হবে। পরের দিন আবার একই নিয়মেমাছ ধরতে হবে। শিং মাছ ধরতে একটা কৌশলঅবলম্বন করতে হয়। একহাতে নুডুল্সেরপ্লাস্টিক ছাকনী আর অন্য হাতে স্টিলের ছোটগামলা দিয়ে মাছ ধরে প্লাস্টিকের বড় পাত্রেরাখতে হবে। এরপর মাছগুলো হাপায় নিয়েছাড়তে হবে।আমি আগেই উল্লেখ করেছি, শিংমাছের পুকুর এক পাশে ঢালু রাখা দরকার। এতেপুকুর সেচ দেয়ার পর সমস্ত মাছ একপাশে চলেআসবে। তা না হলে সমস্ত পুকুর জুড়ে মাছছড়িয়ে থাকবে। মাছ ধরায় খুব সমস্যা হবে।সাধারণত শিং মাছ ধরার সময় একটু সাবধানতাঅবলম্বন করা দরকার।মাছের কাঁটা বিঁধলেসেখানে খুবই ব্যথা হয়। কাঁটা বিঁধানো জায়গায়ব্যথানাশক মলম লাগিয়ে গরম পানি দিলে সাথেসাথে কিছুটা উপশম হয়। এছাড়া মলম লাগিয়েগরম বালির ছ্যাক দিলেও আরাম পাওয়া যায়।তাই শিং মাছ ধরার আগে এমন ব্যবস্থা রাখলেমন্দ হয় না। একটু সাবধানতা অবলম্বন করলেএসবের কিছুরই প্রয়োজন হয় না।

বাজার চাহিদা:
শিং মাছ বাজারের একটি দামি মাছ। ডাক্তাররাবিভিন্ন রোগির পথ্য হিসেবে শিং মাছ খাবারউপদেশ দিয়ে থাকেন। কথায় আছে, শিং মাছেগায়ে দ্রুত রক্ত বৃদ্ধি করে থাকে।এছাড়া দেশীমাছ হিসেবে শিং মাছের চাহিদা ব্যাপক । অতিথিআপ্যায়ন এর জন্য শিং মাছের জুড়ি নেই ।পুকুরে শিং মাছের কীভাবে চাষ করতে হয় তাআলোচনা করা হল। আলোচিত পদ্ধতিতে এককশিং মাছ চাষ করলে প্রতি শতাংশে ৬ মাসেকমপক্ষে ৩২ কেজি হিসেবে এক একরে ৩.২০ টনএবং ১০ মাসে এক একরে প্রায় ৪ টন শিং মাছউৎপাদন সম্ভব । যা আমাদের অর্থনৈতিকঅবস্থার উন্নতির পাশাপাশি বিলুপ্তির হাতথেকেও রক্ষা পাবে এই দেশী জাতের শিং মাছ

Post a Comment

0 Comments

Ad Code

Responsive Advertisement