তেলাপিয়া মাছ আফ্রিকাতে জন্ম নিয়েও এশিয়ার মাছ চাষিদের মন জয় করে মাছ বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার লাভ করেছে তার নিজস্ব যোগ্যতায়। কেবল এশিয়াতেই নয় সারা বিশ্বের প্রায় ১০০টিরও বেশি দেশে এ মাছের চাষ হচ্ছে একক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রজাতি হিসেবে।
ক্রমসম্প্রসারমান এ গুরুত্বপূর্ণ মাছের প্রজাতিটি বাংলাদেশে প্রথম ১৯৫৪ সালে থাইল্যান্ড হতে আনা হয় । এ মাছের অপর একটি প্রজাতি ১৯৭৪ সালে একই দেশ হতে আনা হয়। তবে বর্তমানে মনোসেক্স তেলাপিয়া হিসেবে যে মাছ চাষ করা হচ্ছে সেটি কৌলিতাত্ত্বিক গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবিত মাছ। যা ১৯৯৪ সনে ফিলিপাইন হতে প্রথম দেশে আনা হয়।
বর্তমানে অনেক বেসরকারী হ্যাচারি থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনাম হতে যে তেলাপিয়ার ব্রুড আনছেন তা সবই মূল গিফ্ট জাতের তেলাপিয়া। এ প্রজাতির তেলাপিয়া মূল জাত হতে প্রায় ১.৫ গুণ বেশি ফলন হয়ে থাকে। গিফ্ট জাতের তেলাপিয়ার হরমোন প্রয়োগে উৎপাদিত সব পুরুষ পোনার চাষকেই মনোসেক্স তেলাপিয়া চাষ বলা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে প্রথম এ মাছের চাষ করা হয় ২০০২ সালে। এমাছের সহজতর চাষ পদ্ধতি, দ্রুত বর্ধন, সুস্বাদু, অধিক ঘনত্বে গভীর-অগভীর সকল ধরনের জলাশয়ে চাষের উপযোগীতা, বিস্তৃত পরিবেশ তারতম্য সহ্য ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধী এবং সর্বভূক স্বভাবের কারণে সারা বিশ্বে এ মাছ চাষ দ্রুত সম্পসারিত হচ্ছে। বিগত দুই দশকের মধ্যে এ মাছের চাষের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। বিগত ১৯৯০ সালে গ্লোবাল তেলাপিয়ার উৎপাদন যেখানে ৩,৮৩,৬৫৪ মে. টন (মোট চাষের অধীনে উৎপাদিত মাছের ২.২৮% ) ছিল সেখানে ২০১২ সনে বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫,০৭,০০২ মে.টন (মোট চাষের অধীনে উৎপাদিত মাছের ৬.৮% এবং অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ চাষের ১০.৮% ) উন্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বর্ধন হার আরো অনেক বেশি, ২০০২ সালে যেখানে এ মাছের উৎপাদ ৪,০০০ মে.টন সেখানে ২০১৪-১৫ সনে ৩,৪৭,৮০১ মে.টন উন্নিত হয়েছে যা মোট চাষ থেকে উৎপাদিত মাছের প্রায় ১৭%। দেশে স্বল্পতম সময়ে ৪০০টির বেশি ছোট বড় তেলাপিয়ার হ্যাচারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ২০১৪-১৫ সনে প্রায় ১৬২.৪০ কোটি পোনা উৎপাদিত হয়েছে এবং ৬০০০টির অধিক বাণিজ্যিক মৎস্য খামারে সরবরাহ হয়েছে। ঋঅঙ এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী (২০১৬) বাংলাদেশ পৃথিবীর মৎস্য চাষে অগ্রসর দেশগুলোর মধ্যে ৫ম।
এ স্থান অর্জনের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক চাষের প্রজাতি তেলাপিয়া মাছের উৎপাদন বিশেষ ভূমিকা রেখেছে তাতে কোন সন্দেহ নাই। যেহেতু আমাদের দেশের চাষের অধীনে মাছ উৎপাদনে তেলাপিয়ার ভূমিকা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে সে জন্য, যে কোন কারণে এ মাছের পোনার গুণগতমানের অবনতি হলে দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ঋণাত্বক প্রভাব পড়বে মারাত্বকভাবে। সাম্প্রতিক সময়ে মাছের বাজার দর কমাতে মাছ চাষে চাষির আগ্রহ ধরে রাখার ক্ষেত্রে উন্নতমানের পোনা একান্ত প্রয়োজন। অপরদিকে তেলাপিয়ার গবেষণার ও উৎপাদনের সাথে সম্পৃক্ত ব্যাক্তিবর্গ ইতোমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বেসরকারী পর্যায়ে অপরিকল্পিতভাবে দ্রুত হ্যাচারি কার্যক্রম সম্প্রসারণের কারণে গুণগত মানের পোনা উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে তৃণমূলের মাছ চাষিরা, চাষি সমাবেশগুলোতে প্রায় অভিযোগ করছেন যে, তেলাপিয়া মাছ থেকে আগের মত উৎপাদন পাচ্ছেন না। চাষের কয়েক মাসের মধ্যে পুকুরে অনাকাঙ্খিত পোনা জন্মে মাছের মোট উৎপাদন ও গড় আকারের উপর বিরুপ প্রভাব লক্ষ করছেন। বিভিন্ন হ্যাচারির পোনার দামের মাঝেও বিস্তর ব্যবধান (একক মূল্য ০.২০ হতে ১.৫০ টাকা) দেখেও বোঝা যায় যে, বাজারে প্রাপ্ত সকল পোনার মান সমান নয়। তেলাপিয়া হ্যাচারির কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং মাঠ পর্যায়ে দির্ঘ্যদিন কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের নিবন্ধে হ্যাচারিতে ব্রুড ব্যবস্থাপনায় কি কি ত্রুটির কারণে পোনার গুণাগুণ (ঝববফ ছঁধষরঃু) খারাপ হচ্ছে কেবল সে সব বিষয়ে আলোক পাত করব।
গিফ্ট তেলাপিয়া চাষের পুকুরে তেলাপিয়াঃ
১. উপযুক্ত কারিগরী জ্ঞান সম্পন্ন হ্যাচারি পরিচালকের অভাবঃ
যে কোন মাছের ভাল মানের পোনা উৎপাদন বিশেষকরে তেলাপিয়া মাছের মনোসেক্স পোনা উৎপাদনের জন্য এক জন হ্যাচারি পরিচালকের উপযুক্ত অবকাঠামোগত সুযোগ সুবিধাসহ মাছের জীববিজ্ঞান তথা ব্রুড নির্বাচন, ব্রুড উন্নয়ন, ব্রুড প্রতিপালন বিষয়ে সাম্মক কারিগরী জ্ঞান থাকা আবশ্যক। কার্প হ্যাচারি পরিচালনা বা ক্যাটফিশ হ্যাচারি পরিচালনা আর তেলাপিয়ার হ্যাচারি পরিচালনা এক বিষয় নয়।
তেলাপিয়ার হ্যাচারির ক্ষেত্রে কর্মীদের অধিক কারিগরী জ্ঞান থাকা আবশ্যক, কারণ তেলাপিয়ার ব্রুড নির্বাচন প্রতিপালনে অধিক প্রযুক্তিগত বিষয় জড়িত। বর্তমানে পরিচালিত বেশিরভাগ হ্যাচারির কর্মীর শিক্ষাগত যোগ্যতা পর্যাপ্ত নয়। তারা বেশিরভাগ অন্য হ্যাচারির সহযোগী কর্মীর কাজ করতে গিয়ে ব্যবহারিক কাজগুলো শিখেছে কিন্তু প্রযুক্তিগত উপযুক্ত জ্ঞান না থাকায় তাদের দ্বারা কোন ভাবেই উন্নত মানের পোনা উৎপাদন সম্ভব নয়।
তাদের দ্বারা সংখ্যাগত পোনা উৎপাদন করা যাবে কিন্তু গুণগত মানের পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করা যাবে না। অনেক হ্যাচারির মালিকও এ বিষয়গুলো ভালভাবে জানেন না তাঁরা কেবল কর্মী কি পরিমাণ পোনা উৎপাদন করতে পারল সেটাকেই যোগ্যতার মানদন্ড হিসেবে বিবেচনায় প্রাধান্য দেন।
২. ব্রুড মাছ নির্বাচনে অসচেতনতাঃ
বেশিরভাগ হ্যাচারি পরিচালক/কর্মী সাধারণ চাষের মাছ, আর ব্রুড মাছ এর মাঝের পার্থক্যের বিষয়টি জানেন বা বোঝেন না। অনেকে হ্যাচারি প্রতিষ্ঠার সময় ব্রুড হিসাবে যে সিমিত মাছ সংগ্রহ করে থাকেন তা দিয়েই বংশ পরমপরায় পোনা উৎপাদন করে আসছেন। তেলাপিয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে পোনার মানগত দিকে। কারণ তেলাপিয়ার জীবন কাল কার্পজাতীয় মাছের তূলনায় ছোট।
এরা দ্রুত পরিপক্কতা লাভ করে এবং পুকুরের মধ্যেই বছরে একাধিক বার ডিম দিয়ে থাকে। আবার বেশির ভাগ হ্যাচারি মালিক বা পরিচালক প্রতি বছর ব্রুড সংগ্রহ করেন না বা সংগৃহীত ব্রুড পৃথকভাবে সংরক্ষণ করেন না। প্রথমত তারা অনেকে এর প্রয়োজনীয়তাই বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। অনেকে জেনেও পৃথক পৃথক ব্রুডের জন্য পৃথক পুকুর প্রয়োজন হয় তাতে খরচ বেশি পড়ার ভয়ে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করেন না।
অনেকের ক্ষেত্রে বাস্তবতা হচ্ছে, যে ব্রুড পুকুর থেকে প্রতি উৎপাদন মৌসুমে ডিম সংগ্রহ করেন সেখানে এমনিতেয় অনেক পোনা উৎপাদন হয়, সে পোনাই ক্রমে হ্যাচারি মালিকের জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে ব্রুডে সংযুক্ত হয়। কারণ ডিম সংগ্রহের ব্রুডের পুকুরে উৎপাদিত অনাকাঙ্খিত পোনা অপসারণের কোন ব্যবস্থা হ্যাচারিগুলোতে দেখা যায় না। আমরা জানি তেলাপিয়া ৩ মাস বয়সেই পরিপক্কতালাভ করে এবং ডিম উৎপানে সক্ষম হয়। অর্থাৎ হ্যাচারি মালিকের অগোচরেই তাঁর ব্রুডের সাথে নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে যায়। এভাবে ব্রুড সংযুক্ত হলে কোনভাবেই ভাল মানের পোনা উৎপাদন করা যাবে না।
করণীয়ঃ
ব্রুড মাছ একটি পরিকল্পিত উপায়ে উৎপাদিত কৌলিতাত্ত্বিকভাবে সমৃদ্ধ গুণাবলি সম্বলিত মাছ। অপরিকল্পিতভাবে কোন ব্রুড মাছ মজুদে সংযুক্ত করা যাবে না। এবিষয়ে অবশ্যই যতœবান হতে হবে এবং কোন সনামদন্য প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত এবং ব্রুড হিসাবে ঘোষিত তেলাপিয়ার পর্যাপ্ত সংখ্যক পোনা মাছ সংগ্রহ করে তার থেকে বাছাই করে ভাল বর্ধনশীল মাছগুলোকে ব্রুড হিসাবে নির্বাচন করে (ঝবষবপঃরড়হ) খামারে রাখতে হবে।
ব্রুড তৈরির জন্য পোনা বিদেশ থেকেও আনার ক্ষেত্রে এবিষয়ে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। সংগৃহীত (১+ বয়স) ব্রুড হতে ২য় ও ৩য় বছর ডিম সংগ্রহ করে সে ব্রুড বাতিল করে বাজারে পাঠিয়ে দিতে হবে। যতই সে ব্রুডের স্বাস্থ্য ভাল থাক বা ডিম উৎপাদনে সক্ষম হোক। একটি নির্দষ্ট বয়সের পর ব্রুড হতে উৎপাদিত পোনার গুণাগুণ ভাল হয় না। প্রতি বছরের ব্রুড পৃথকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এক ব্যাচের সাথে আর এক ব্যাচের মধ্যে মিশ্রিত করে রাখলে ব্রুড ছাটাইয়ে জটিল সমস্যা দেখা দিবে।
পারতপক্ষে নিজের খামারের মাছ হতে ব্রুড সংগ্রহ না করায় উত্তম। নিজের খামার থেকে ব্রুড সংগ্রহের ক্ষেত্রে পৃথক ব্যবস্থাপনা/কৌশল প্রয়োগ করতে হবে। তবে গুণগত মান বজায় রেখে সকল খামারের জন্য নিজস্ব ব্রুড উৎপাদন অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব নয় বা এ কৌশল আর্থিকভাবে লাভজনক নাও হতে পারে।
৩. অন্তঃপ্রজনন সমস্যাঃ
আগের অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে কিভাবে ব্রুড মাছের পুকুরে অনাকাঙ্খিত বাচ্চা উৎপাদিত হয়ে ব্রুডে পরিণত হচ্ছে। এভাবে অধিকাংশ হ্যাচারিতে একই পুকুরে একই সাথে দাদা-দাদি, নান-নানি, বাবা-মা, নাতি-নাতিনসহ কয়েক বংশধর একই পুকুরে থাকাতে কাছা কাছি রক্তের সম্পর্কীয়দের মাঝে প্রজনন ঘটে এর ফলে যে বাচ্চা উৎপাদিত হয় তা মারাত্বকভাবে অন্তঃপ্রজননে দূষিত । কার্পজাতীয় মাছের অন্তঃপ্রজনন ঘটতে অনেক সময় লাগে কিন্তু তেলাপিয়ার একটি হ্যাচারিতে এ সমস্যাটি খুব দ্রুত সংঘঠিত হয়, যদি হ্যাচারির কর্মীগণ এ বিষয়ে বিশেষ সচেতন না থাকেন।
তেলাপিয়া পুকুরের পরিবেশে ডিম ছাড়ে এবং অল্প বয়সে পরিপক্কতালাভ করে এবং একই বছরে কয়েক বার ডিম দেয় ফলে অন্য মাছের তুলনায় তেলাপিয়ার অন্তঃপ্রজনন সমস্যা অধিকতর প্রকট আকারে ঘটে। অন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে উৎপাদিত পোনা প্রতি বংশে পৈত্রিক বৈশিষ্ট্যের ২৫% গুণাগুণ হারায়। এ বিষয়ে অধিকাংশ হ্যাচারি মালিক বা কর্মী অজ্ঞতার কারণে অন্তঃপ্রজনন পরিহারের পদক্ষেপ বিষয়ে তাঁরা ভাবেন না। এর ফলেই অধিকাংশ হ্যাচারির পোনার গুণগত মান অবনয়ন ঘটে।
সমস্যা উত্তরণের উপায়ঃ
প্রথমত নিজস্ব হ্যাচারির পোনা থেকে ব্রুড উৎপাদন পরিহার করতে হবে। যদি করতেই হয় তবে অন্য একটি উৎসের ব্রুডের সাথে লিঙ্গ পরিবর্তন করতে হবে। বিষয়টি এরুপ যে নিজের ব্রুড পুকুর থেকে নির্দিষ্ট সময়ে সংগৃহীত পোনা একটি পৃথক পুকুরে প্রতি পালন করতে হবে এবং অপর উৎস থেকে আনা ব্রুড অপর একটি পুকুরে পৃথকভাবে প্রতিপালন করে উভয় গ্রুপের মধ্যে হতে ব্রুড বাছাই করার সময় এক মজুদের (ঝঃড়পশ) পুরুষের সাথে অন্য মজুদের স্ত্রী মাছের সাথে জুটি বাধতে দিতে হবে।
এটা একধরনের ব্রুড নির্বাচন কৌশল যার মাধ্যমে অন্তঃপ্রজনন পরিহার করা যায়। তবে ভাল হয় প্রতি বছর নতুন এক ব্যাচ মাছ আনা এবং তা পৃথকভাবে লালন পালন করে অধিকতর ভালোগুলোকে ব্রুড হিসাবে নির্বাচন করা। এভাবে দেখা যাবে একটি হ্যাচারিতে ৩টি পৃথক ব্যাচ থাকে এবং প্রতি বছর একটি ব্যাচ বাজরে যাবে বাতিল হিসাবে এবং নতুন একটি ব্যাচ যুক্ত হবে উৎপাদনে। আরো পরিস্কার ভাবে বলা যায় একটি হ্যাচারিতে যদি ৩০০০০টি ব্রুড মাছ থেকে পোনা উৎপাদনের কার্যক্রম থাকে তবে ১৫০০০টি হবে একই বয়সের বয়স্ক ব্যচ (ঋ১) এবং অপর ১৫০০০টি হবে আর একই কম বয়সের ব্যাচ।
এর পাশাপাশি আর একটি নবাগত ব্যাচের ব্রুডের জন্য ২০০০০টি নতুন ব্রুডের পোনা সংগ্রহে পৃথকভাবে প্রতিপালন করতে হবে যেখান থেকে এক বছর বয়সের ১৫০০০টি নতুন ব্রুড নির্বাচন করা যাবে। ব্যাচ যখন উৎপাদনে যুক্ত হবে তখন ব্যাচ বাজারে চলে যাবে। তাহলে নতুন ১৫০০০টি সহ পুনরায় ৩০০০০টি ব্রুড ঠিক থাকবে। এভাবে আবার পরের বছরের জন্য ব্যাচ ২০০০০টি পোনা আনতে হবে। প্রতি বছর একটি নতুন ব্যাচে উৎপাদনে যুক্ত হবে এবং একটি বয়স্ক ব্যাচ বাতিল হয়ে খাবার যোগ্য মাছ হিসেবে বাজারে চলে যাবে। এক ব্যাচের সাথে অপর ব্যাচ মিশিয়ে ফেল্লে ব্রুডের মান বজায় রাখা যাবে না। এ ধরনের মজুদ থেকে উৎপাদিন পোনার গুণাগুণ একই রকম হবে না ফলে চাষের মাছে আকার ছোট বড় ব্যবধান বেশি হবে এবং মোট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হবে।
৪. ব্রুড প্রতিপালনঃ
যতই উন্নত মানের ব্রুড মাছ সংগ্রহ করা হোক না কেন যদি তা ভালভাবে উপযুক্ত পরিবেশে লালন পালন না করা হয় তা থেকে ভাল মানের পোনা আশা করা যায় না। অধিকাংশ হ্যাচারির ব্রুড মাছের ব্যবস্থাপনা ভাল নয় বা কিভাবে করলে ভাল বলা যাবে সেটাও অনেকে জানেন না। আবার অনেকে জানলেও খরচ কমাবার জন্য এ ক্ষেত্রে আপোষ করতে দেখা যায়। এর ফলে পোনার মানের উপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে এবং মাছ চাষি সঠিক উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হন।
এখানে হ্যাচারি মালিক লাভ ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিতে চান না। তবে পরিণতিতে তিনিও ক্ষতিগ্রস্থ হন। কারণ মাছ চাষি সকল সময় তার উৎপাদন অন্যদের সাথে তুলনা করেন এবং তার উৎপাদন যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেন। চাষি একবার ক্ষতিগ্রস্থ হলে ২য় বার একই উৎসের পোনা সাধারণত ক্রয় করেন না, ফলে হ্যাচারি মালিক তাঁর ক্রেতা হারাণর ঝুকিতে পড়ে যাবেন। ব্রুড প্রতিপালনের ক্ষেত্রে সংঘটিত প্রধান সমস্যাগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হল
ব্রুড প্রতিপালন সংঘটিত সমস্যাঃ
ক. ব্রুড মাছের পুকুর উপযুক্ত নয়ঃ
ব্রুড মাছের পুকুর যে ভাবে খনন করার প্রয়োজন বা ব্রুড প্রতিপালন পুকুরের অবটাঠামোগত সুবিধা থাকতে হবে সে বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রে সঠিকভাবে অনুসরণ করেন না। যার ফলে ব্রুড প্রতিপালন সঠিকভাবে করতে পারেন না। এ ব্রুড থেকে যে পোনা উৎপাদিত হয় তা মান সম্পন্ন হয় না। অধিকাংশ হ্যাচারিতে ব্রুড মাছ সারসরি পুকুরে রেখে ডিম সংগ্রহ করা হয় সে জন্য ব্রুডের পুকরে সারা বছর একটি নির্দিষ্ট গভীরতায় (৫-৬‘) পানি রাখতে হবে এবং সে গভীরতা নিশ্চিত করার জন্য পাড়ের নিদিষ্ট উচ্চতায় পানির বহিঃগমণ পথ রাখতে হবে যাতে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায় এবং নির্দিষ্টি গভীরতা বজায় থাকে।
পুকুরের তলদেশ সমান হতে হবে এবং একদিকে ঢালু হলে ভাল হয়। পুকুরটি আয়তকার তথা কিছুটা লম্বাকার হলে ভাল হয়। পুকুরের আয়তন ৩০-৩৫ শতাংশ হলে ব্রুড পরিচর্যা বা ব্রুড ধরে ডিম সংগ্রহে সুবিধা হয়। তবে যারা হাপা পদ্ধতিতে ব্রুড সংরক্ষণ করেন তাদের ক্ষেতে আরো বড় আকারের পুকুর হলেও সমস্যা নাই। পুকুরের সমস্ত পানি প্রয়োজনে বের করে দেবার জন্য নির্গমণ পথ রাখতে হবে। এসব বিষয়ে তেলাপিয়ার হ্যাচারি মালিককে যত্নবান হতে হবে ভাল মানের পোনা উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য।
খ. অধিক ঘনত্বে ব্রুড সংরক্ষণঃ
সব মাছের জন্য কত আয়তনের পুকুরে কতগুলো মাছ লালন পালন করা যাবে তার একটি আদর্শ পরিমাণ আছে। বিশেষ করে ব্রুড মাছের ক্ষেত্রে এ বিষটি অধিকতর গুরুত্বের দাবি রাখে। কিন্ত বেশির ভাগ হ্যাচারির ব্রুড পুকুরে অধিক ঘনত্বে মাছ রাখা হয়, যার জন্য উৎপাদিত পোনার গুণগত মানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মা মাছ যত স্বাচ্ছন্দে থাকবে তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গের বর্ধন তত ভাল হবে। ভাল মানের উৎপাদনের জন্য প্রতি শতাংশে ৯০টির মত ব্রুড রাখা যেতে পারে। যার ৬০টি মাছ এবং ৩০টি পুরুষ মাছ হবে।
অর্থাৎ স্ত্রী এবং পুরুষের অনুপাত ২ঃ১ হতে পারে তবে ৩ঃ১ হলেও তেমন কোন সমস্যা হয় না। হাপার ক্ষেত্রে প্রতি ঘন মিটারে একই অনুপাতে ২-৩টি ব্রুড রাখা যেতে পারে। অধিক ঘনত্বে ব্রুড থাকলে মা মাছে দেরীতে ডিম আসে এবং ডিমের পরিমাণ কম হয় এবং ডিমের পুষ্টির মানও ভাল হয় না ফলে এ ডিম থেকে উৎপাদিত পোনার মান কোন ভাবেই ভাল হতে পারে না।
গ. ভাল মানের খাদ্য সরবরাহ করাঃ
সাধারণভাবে সকলেই জানে যে, মায়ের স্বাস্থ্য ভাল হলে তাঁর থেকে উৎপাদিত বাচ্চার স্বাস্থ্যও ভাল হবে। মাকে হ্রষ্ট-পুষ্ট রাখার জন্য ভাল পুষ্টিমানের খাদ্য পরিমিত পুরমাণে খাওয়াতে হবে। কিন্তু এ বিষয়েও অনেক হ্যাচারি পরিচালকগণ যতœ বান নন। সাধারণ মাছ চাষের মাছ, আর ব্রুড মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা এক নয়।
ব্রুডের ক্ষেত্রে খাদ্য সুষম কিনা সেটা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ভাল ব্রুড পরিচর্যা নিশ্চিত করার জন্য বাজারের খাবারের সাথে বাড়তি ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স খাদ্যের সাথে মিশিয়ে মাঝে মধ্যে ব্রুড মাছকে খাওয়াতে হবে, যাতে খাদ্যে কোন দরকারী উপাদানের ঘাটতি না হয় যে হ্যাচারির ব্রুড মাছের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ভাল সে হ্যাচারির পোনার বাচার ও বর্ধন হার অবশ্যই ভাল হবে।
ঘ. পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনাঃ
তেলাপিয়ার হ্যাচারির ব্রুড পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রুড পুকুরের পানির রাসায়নিক গুণাগুণ আদর্শ মাত্রায় আছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কোন হ্যাচারির পুকুরের রাসায়নিক গুণাগুণ পরীক্ষার কোন তথ্য পাওয়া যায় না। নুন্যতম সপ্তাহে একবার এসকল রাসায়নিক উপাদানের পরিমাপ নিতে হবে। ব্রুড ব্যবস্থাপনায় এটি খুবই গুরুত্বের দাবি রাখে। ব্রুড মাছের পুকুরে পানি পরিবর্তন ব্যবস্থার পাশাপাশি এ্যারেশন সুবিধা থাকলে ভাল হয়।
কিন্ত পরিতাপের বিষয় অধিকাংশ হ্যাচারির ব্রুড মাছের পুকুরে এধরনের কোন ব্যবস্থা দেখা যায় না। আর এ ব্যবস্থা না থাকার কারণে অধিকাংশ ব্রুড মাছের পুকুরে ভোরে মাছ ভেষে খাবি খেতে দেখা যায়। অত্যান্ত পরিতাপের বিষয় এটাকে অনেকে সমস্যা বলে মনে করেন না। ব্রুড মাছ অক্সিজেন ঘাটতি জনিত সমস্যাই থাকলে তার গোনাডের স্বাভাবিক বর্ধণ বাধা গ্রস্থ হয়। এ ধরনের পীড়ন অবস্থায় থাকা ব্রুড মাছ থেকে উৎপাদিত ডিম ভালভাবে পুষ্ট হয় না এবং এ ডিম থেকে উৎপাদিত পোনার মান ভাল হয় না।
প্যাডেল হুইল এ্যারেশন ভাল ভ্রুড মাছ বাছাইঃ
৫. হ্যাচারিতে অপরিণত বয়স এবং ছোট আকারের ব্রুড মাছ ব্যবহারঃ
ব্রুড হিসেবে যে মাছ নির্বাচর করতে হবে তার বয়স অবশ্যই ১ বছর পূর্ণ হতে হবে। অধিকাংশ হ্যাচারিতে এ বিষয়টি অনুসরণ করা হয় না ডিম আছে অতএব ব্রুড হিসেবে সে মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করা যেতে পারে। কিন্তু তেলাপিয়া মাছ তিন মাস বয়স এবং ৩০-৩৪ গ্রাম আকারের হলেই পরিপক্কতা লাভ করতে দেখা যায়। কিন্তু একটি মরিমিত বয়স এবং আকার না হলে সে মাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করলে ভাল মানের বাচ্চা উৎপাদিত হবে না। ব্রুড মাছের আকার কম পক্ষে ১৫০ গ্রামের উপরে হতে হবে। বেশি বয়স্ক (৩+) এবং বেশি বড় আকারের ব্রুড মাছের থেকেও ভাল মানের ডিম পাওয়া যায় না। বেশি বড় আকারের ব্রুড মাছ ব্যবহার উপযোগী নয় এবং আর্থিকভাবেও লাভজনক নয়।
অধিকাংশ হ্যাচারি মালিক ব্যবসার লাভের দিকটাকে বেশি প্রাধান্য দেন এ কারণে স্বল্প সংখ্যক ব্রুড বার বার ব্যবহার করে পোনা উৎপাদনের কৌশল অবলম্বন করেন। অল্প ব্রুড প্রতিপালনে কম সংখ্যক পুকুর লাগে এবং ব্যবস্থাপনায় খরচও কম লাগে। কিন্তু এর ফলে উৎপাদিত পোনার মান ভাল হয় না এবং দ্রুত অন্তঃপ্রজনন সমস্যার সম্মূখিন হয়। প্রতিটি হ্যাচারিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক ব্রুড রাখা একান্ত প্রয়োজন এবং একটি উৎপাদন মৌসুমে একটি ব্রুড মাছ থেকে দুই বারের বেশি ডিম সংগ্রহ না করায় ভাল। এ ক্ষেত্রে স্পেন্ট ব্রুড মাছ কে ভাল খাবার ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
৬. ব্রুডের কুল নামা সংরক্ষণ না করাঃ
প্রতি বছর সংগৃহীত ব্রুড মাছের উৎস্য, সংগ্রহের সময় কাল, কত নাম্বর পুকুরে মজুদ করা হয়েছে, সংগৃহীত ব্রুডের পূর্বপুরুষ এর উৎস্য, রোগের ইতিহাস একটি রেজিষ্টারে যতœসহকারে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রতিবার স্থানান্তার এবং ডিম সংগ্রহের তথ্য লিপি বদ্ধ রাখতে হবে। উক্ত ব্যাচের পোনা উৎপাদন এবং পোনার সার্বিক ফলাফল তথ্য যতটুকু পারা যায় সংরক্ষণ করতে হবে। এ ধরনের তথ্য, বিশ্লেষণ করে ব্রুড সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সুবিধা হয়।
৭. ব্রুড মাছের পুকুরের অনাকাঙ্খিত পোনা অপসারণের ব্যবস্থা না থাকাঃ
আগেই বলা হয়েছে যে তেলাপিয়ার ব্রুড মাছ যেখানে লালন পালন করা হয় সেখানে অনাকাঙ্খিত পোনা উৎপাদন হয় সে জন্য উক্ত পোনা অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। প্রথমত হ্যাচারির কর্মীদের এর খারাপ দিকগুলো বুঝাতে হবে এবং তাঁরা কোন ভাবেই ব্রুডের পুকুরে পোনা বড় হতে না দেয় সে বিষয়ে যতœবান হতে বলতে হবে। পোনা মাছ খেয়ে বড় হয় এধরনের প্রজাতির মাছ যেমনঃ চিতল, ফলি, পাবদা জাতীয় কিছুমাছ ব্রুডের পুকুরে ছেড়েদিতে হবে। এর ফলে অনাকাঙ্খিত পোনার সংখ্যা রোধ করা যাবে এবং উল্লেখিত মাছের একটি বাড়তি উৎপাদনও পাওয়া যেতে পারে।
উপসংহারঃ
যেহেতু তেলাপিয়া মাছ দ্রত বড় হয়, পরিবেশের তারতম্য সহ্য করতে পারে, অল্প জায়গায় অনেক বেশি উৎপাদন হয় সে জন্য চাষি এ মাছ চাষ অব্যাহত রাখবে এটাই স্বাভাবিক। সুখোর বিষয় ওয়াল্ড ফিস সেন্টার বাংলাদেশ, দেশের কয়েকটি স্থানে বেসরকারী হ্যাচারি মালিকের সহযোগীতায় তেলাপিয়ার উন্নত ব্রুড উৎপাদনে তেলাপিয়ার ব্রিডিং নিউক্লিয়াস প্রতিষ্ঠা করে স্বল্প পরিসরে হলেও উন্নত ব্রুডের উৎপাদনে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যা কিছু হ্যাচারির ব্রুড সরবরাহে সক্ষম হচ্ছে। আরো একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে তেলাপিয়ার পোনা উৎপাদনে বেশ কয়েকটি করপরেট কোম্পানি যুক্ত হয়েছে, তাঁদের খামারের ব্যবস্থাপনাও ভাল এবং উৎপাদিত পোনার ফলাফল যথেষ্ট ভাল বলে চাষিরা অভিমত প্রকাশ করছেন।
কিন্তু তেলাপিয়া চাষে ব্যবহৃত পোনার খুবই সামান্য অংশ তাঁরা পূরণ করতে পারছেন। দেশের চাষের অধিনে মাছ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার জন্য অন্যান্য হ্যাচারির পোনার গুণগত মান উন্নয়নে ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। গুণগত মানের পোনা নিশ্চিত করার জন্য কেবল জাত নয়, আলোচিত সকল বিষয়ে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে যে হ্যাচারি যতটা যত্নবান হবেন তাঁর পোনার মান তত ভাল হবে বলে আশা করা যায়।



0 Comments